সাম্প্রতিক উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় toplum ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। রাতারাতি শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই 'ফলাফল বিপর্যয়'। এই আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে একতরফাভাবে দায়ী করার প্রবণতা। নিঃসন্দেহে, শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক স্তরেই রচিত হয় এবং সেখানে ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব উচ্চতর স্তরে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এইচএসসি ফলাফলের এই চিত্রকে কেবল প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বলতার ফল হিসেবে চিহ্নিত করা একটি সরলীকরণ এবং মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার নামান্তর।
এই সংকটের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি বহুমাত্রিক এবং এর শেকড় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তরে ছড়িয়ে আছে। কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিকূল পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ঘাটতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় এবং শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাত্রা—এই প্রতিটি বিষয়ই সম্মিলিতভাবে আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি ও বাস্তবতা
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, "বাংলাদেশে শেখার সংকট শুরু হয় খুব শুরুর দিকেই। প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হয়।"[1] তার এই বক্তব্যকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় ৯৮.৫ শতাংশে পৌঁছালেও ঝরে পড়ার হারও কম নয়।[2] জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (NAPE) মূল্যায়ন অনুযায়ী, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৫ শতাংশ বাংলা ও গণিত বিষয়ে মৌলিক ধারণা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।[2] বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়ে দুর্বলতা উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বড় প্রভাব ফেলছে, যা এবারের ফলাফলে স্পষ্ট।[3][4]
একতরফা দোষারোপের বাইরে মূল সমস্যাসমূহ
কেবল প্রাথমিক শিক্ষাকে দায়ী করে অন্য সংকটগুলোকে আড়াল করা হলে তা হবে জাতির জন্য আত্মঘাতী। এইচএসসি ফলাফলের এই বিপর্যয়ের পেছনে আরও কিছু গভীর এবং জটিল কারণ বিদ্যমান।
১. কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংকট:
বছরের পর বছর ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত মুখস্থনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক।[5] শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা অর্জনের চেয়ে ভালো জিপিএ অর্জনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য পরিমাপ করার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল।[1][6] শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে পরীক্ষকদের প্রতি 'ওভারমার্কিং' বা নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অলিখিত নির্দেশনা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।[7] এবারের কঠোর মূল্যায়ন সেই কৃত্রিম সাফল্যের মুখোশ উন্মোচন করেছে।[3][8] যে শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং উদার মূল্যায়নে অভ্যস্ত ছিল, তারা পূর্ণ সিলেবাস ও কঠোর মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছে।[9] এটি প্রমাণ করে যে, সমস্যা কেবল শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতিতে নয়, বরং আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থার দ্বিচারিতায়ও নিহিত।
২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা:
শিক্ষার পরিবেশ কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, এর সঙ্গে জড়িত সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা এবং আনন্দময় শিখন প্রক্রিয়া।[10] দেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণের অভাব প্রকট।[2][11] শহর এবং গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান।[12][13] একটি জরাজীর্ণ এবং অনুন্নত পরিবেশে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না, যা তাদের ঝরে পড়তে উৎসাহিত করে।[14] সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেও তার সুষম বণ্টন এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।[15]
৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়:
শিক্ষার মতো একটি মৌলিক খাতও সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের বাইরে নয়। অতীতে পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর রাজনৈতিক চাপ ছিল বলে মনে করেন অনেক শিক্ষাবিদ।[16] এর ফলে শিক্ষার প্রকৃত সংকট আড়ালে চলে গিয়েছিল।[1] পাশাপাশি, কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের মতো অনৈতিক চর্চাগুলো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি 학생 এবং অভিভাবকদের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষের গুরুত্ব কমে গিয়ে প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং সেন্টার-নির্ভরতা বেড়েছে, যা শিক্ষার ব্যয় বাড়িয়েছে এবং বহু দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা এই অসম প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছে।[6]
৪. শিক্ষকদের নিম্ন জীবনযাত্রার মান:
শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষকেরা। অথচ দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ৯৪ শতাংশেরও বেশি দায়িত্ব পালনকারী বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা চরম আর্থিক বঞ্চনা এবং সামাজিক অমর্যাদার শিকার।[17] একজন সরকারি শিক্ষকের তুলনায় তাদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা অত্যন্ত নগণ্য।[5][18] নামমাত্র বেতনে একজন শিক্ষক যখন তার পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খান, তখন তার কাছ থেকে শ্রেণিকক্ষে শতভাগ মনোযোগ ও নিবেদন আশা করাটা অবাস্তব।[19] এই আর্থিক দৈন্যদশা এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করছে।[5] একজন অতৃপ্ত এবং হতাশ শিক্ষক দ্বারা আলোকিত প্রজন্ম গড়া সম্ভব নয়।
উত্তরণের পথ: একটি সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ফলাফলকে কেবল শিক্ষার্থী বা প্রাথমিক শিক্ষার ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে, একে পুরো ব্যবস্থার আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।[1] সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা:
কারিকুলাম সংস্কার: মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্লেষণাত্মক, সৃজনশীল ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন: শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে এনে সব প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি: শিক্ষকদের, বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন এবং তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার: ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করবে।
সামাজিক সচেতনতা: জিপিএ-৫ এর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের দায় কোনো একটি নির্দিষ্ট স্তরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি সহজ সমাধান, কিন্তু তা প্রকৃত মুক্তির পথ নয়। শিক্ষার গোড়ায় যে দুর্বলতা রয়েছে, তার সঙ্গে কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষকের হতাশা এবং ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি целостный (holistic) দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই একটি শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব, যারা भविष्यের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।
Comments
Post a Comment